ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১০ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

একবছরের বেতন অগ্রিম পেয়েছিলাম!!


প্রকাশিত:
১৩ জুলাই ২০২০ ২০:৩৩

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ০৩:৩৩

আর জে টুটুল

টিউশনির গল্প-২ : এক বছরের অগ্রিম বেতন দিয়েছিলেন আমার স্টুডেন্টের বাবা! জ্বি, সত্যি বলছি।

গল্পের ধারাবাহিকতায় এটা দ্বিতীয় গল্প হলেও, টিউশনি হিসেবে ওটাই ছিল আমার প্রথম, অভিষেক । নব্বই দশকের একদম শেষের দিকের ঘটনা।

এসএসসি পরীক্ষার দেড় বছর আগেই আব্বু মারা গেলেন। এরপর ভাইয়ের সংসারে আমি আর মা স্থায়ী হলাম। আমার এসএসসি পরীক্ষার পরে, ঠিক রেজাল্টের আগেই সাংসারিক বিভিন্ন কারণে মা'কে নিয়ে শুরু হয় আমার ভিন্ন সংসার। ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ছোট্ট একটা বাসা নিয়ে শুরু হয় মা-ছেলের সংসার। পকেটে কোন টাকা নাই। মাত্রই এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, ছোট মানুষ আমি। মায়ের অল্প কিছু জমানো টাকাই ভরসা। টিউশনি খুঁজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম। একই মহল্লার পাশের ভবনের দুটো ছাত্র-ছাত্রী। ওরা ভাইবোন। একজন ক্লাস থ্রি-তে, অন্যজন ক্লাস সিক্সে পড়ে।

তো কি করে জুটলো এই টিউশনি?

আমার বাসার সামনেই ছিল একটা মুদি দোকান। দোকানের মালিক ছিলেন আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। একদিন উনার সাথে সাংসারিক আলাপ করছিলাম, উনি খুব মনযোগ দিয়ে শুনছিলেন, কষ্ট পাচ্ছিলেন। টিউশনি খুঁজতেছি সেটাও বলছিলাম। উনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন।

তো এতক্ষণ খেয়ালই করিনি যে, পাশে দাঁড়িয়ে মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক আমাদের আলাপচারিতা শুনছিলেন। হঠাৎ করেই উনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'তুমি আমার সন্তানের মতো, চিন্তা করোনা, এখন থেকে আমার ছেলেমেয়েকে তুমিই পড়াবে, ওদের আগের টিচারকে আপাতত স্টপ করে দিচ্ছি। ওই টিচারের এমনিতেই অনেকগুলো টিউশনি আছে, কিন্তু তোমার তো একটাও নাই, পারবে তো?'

একটানা এতগুলো কথা শুনেই যাচ্ছিলাম। উনি 'পারবে তো' বলার সাথে সাথেই মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালাম। বিকেলে বাসায় যেতে বললেন।

জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা। গেলাম সেই বাসায়। ড্রয়িং রুমে বসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই 'আঙ্কেল' এলেন, সাথে ছেলেমেয়ে দু'জন এবং আন্টি। হাসিমুখে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আন্টিও স্নেহের সুরেই কথা বলছিলেন। ভিতর থেকে প্রচুর খাবার এলো, চা এলো। আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম। আন্টি আর ছেলেমেয়ে দু'জন ভিতরে চলে গেলো।

আঙ্কেল এগিয়ে এসে বললেন, 'আমি জানি তোমার এখন কি অবস্থা চলছে, নিজের লেখাপড়াও কিন্তু চালিয়ে যেতে হবে, তোমার যখন যা প্রয়োজন আমাকে বলবে, আর শোন আমি আপাতত দুই হাজার টাকা বেতন ধরলাম। ভালো করে পড়াও, সামনে আরো বাড়িয়ে দিবো।’

কথা শেষ করে উনি যা করলেন, সেটার জন্য আমি তো প্রস্তুত ছিলামই না, বরং অবিশ্বাস্যও বটে!
উনি মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে গুনে গুনে চব্বিশ হাজার টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, 'এই নাও, একবছরের অগ্রিম বেতন দিলাম, তোমার এই মুহূর্তে এক সাথে বেশ কিছু টাকা দরকার, তাই দিলাম। প্রতিমাসে অল্প অল্প করে কেটে নিবো, চিন্তা করোনা।’

রীতিমতো আমার হাত কাঁপছিল, মুখা কথা আসছিল না, চোখ ভিজে যাচ্ছিল।

পরদিন থেকে পড়ানো শুরু করলাম। শুরু হলো আমার টিউশনি পেশা!

এরপর ওদেরকে প্রায় চার বছর পড়িয়েছিলাম, অথচ প্রতিমাসেই সেই আঙ্কেল আমাকে প্রায় পুরো বেতনই দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি মাত্র সাত মাস পর বেতনও বাড়িয়েছিলেন! আমি অগ্রিম টাকা কেটে নেয়ার কথা বললে উনি শুধু হাসিমুখে বলতেন, 'আরে তুমি তো আমার ছেলের মতোই।’

চারবছর পর অবশ্য বিশেষ প্রয়োজনে কেরাণীগঞ্জ ছেড়ে পুরান ঢাকার বাসিন্দা হয়ে যাই, ঐ টিউশনিটাও ছেড়ে দিতে হয়।

এরপর আরো দু'বছর পর জানতে পারি, সেই আঙ্কেল স্ট্রোক করে মারা গেছেন। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, ওদের বাসায় গিয়ে দেখা করে এসেছি।

আমি রয়ে গেলাম ঋণী!

টিউশনির গল্পগুলো এমনও হয়......

লেখক: আর জে ও সাংস্কৃতিক কর্মী




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top