ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১১ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭


গল্প

সব জীবন কেসওয়াচাকা’র নয়


প্রকাশিত:
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২১:৪৮

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ০৯:২৭

কেসওয়াচাকা, তোর কাছে আমি আর ফিরছি না বা আসিইনি কোনোদিন। তুই শুধু শুধু ঘাস। আমার ঘাসজীবন তুই দেখিসনি : নেরুদা

এই আমার শেষ দিন বা অন্যভাবে দেখলে আজ থেকে শুরু হবে ফের নতুন দিন। আজি অক্টোবর। স্টকহোমে শীতের রাতে জর্জেন্ডেন পার্কে একটা ছোট ক্যাফেতে বসে আছি। না, এখনও আমার হেরিং অথবা ব্লানডাড ফ্রুক্টশপ্পা’র (এক ধরনের সুইডিশ ফলের সুপ) অর্ডার দেওয়া হয়নি। হেপবার্ণ আমার দিকে বারবার নজর রাখছে। হেপবার্ণ খুব কেতাদুরস্ত। কিন্তু তার দিকে মাঝে মাঝে আমার নজর গেলেও যায়নি আসলে। আমি ব্যস্ত দিন শেষ বা শুরুর শেষ ছক কাটায়।

ছোট দ্বীপের মধ্যে পার্ক। চারিদিকি সবুজ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বিকালটা কেটেছে আইসবারে। একাই। ব্রিলাই এভিনিউর ফিফথ লেনের সোনেটার বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর। সম্ভবত সোনেটার সাথে আর দেখা হবে না। অথবা আমাকে ভাবতে হবে আমাদের দেখা হয়নি কোনোকালেই। ওই বাসা থেকে বেরিয়ে দ্বিতল বাসে এসে নামি সেনজা সেন্টারের স্টপেজে। সেখান থেকে একটু ডান দিকে এগুলে আইসবার। সন্ধ্যা কড়া নাড়ছে, বিকাল বিদায় নিচ্ছে এরকম সময়ে আমার কেন যেন মনে হয় সব শহর বা গ্রামেই কোনো মেহমান বিদায় নিচ্ছে। কোনো নতুন মেহমান ফিরে এসেছে। সময়টা যেন হোটেলের চ্যাক আউট বা ইনের মতো। আইসবারে ঢোকার সময় দেখি , আগেও এমন মনে হয়েছে, যেন এ বারে ঢোকার পথে ‘ সিলভার সমর্থিত ভদকা পানকারীরা’ ক্যামেরা নিয়ে সশস্ত্র। ছোট টেবিল আর ছোট টুলে বসে পান করার ফাঁকে আমার মনে হয় ওয়েটাররা এতোবেশি কাস্টমার কেয়ারে তটস্থ যে কেউ কেউ মলত্যাগও করেননি যেন জীবনে। মানে এতো গিভ এন্ড টেক ব্যস্ত যে মলত্যাগের দরকার নেই তাদের। এতো মলত্যাগহীন জীবন!

আমি স্টকহোমে যখন বছর সাতেক আগে একটা কাজে প্রথম এসেছিলাম তখনই সোনেটার সাথে পরিচয়। সে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল শহরের বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট ‘ডেন গিলডেন ফ্রেডেন’ এ। ও আচ্ছা, এটিই নাকি এ শহরের, নাহ, পৃথিবীরও পুরনো রেস্তেরা। অভিজাতদের। সেই ১৭২২ সালে নির্মিত হয়েছিল। নির্মাণের পর থেকে এখনও এর অন্দরের সাজসজ্জা একটুও পরিবর্তন করা হয়নি। সোনেটা আমাকে সেইরাতে ডিনার করিয়েছিল ফ্ল্যাট ব্রেড ও হোয়াইটফিশ দিয়ে। পরে ভ্যানিলা কাস্টার্ড।

হেপবার্ণ এ শীতেও খুব লং গাউন পরেনি। তাকে ইশারা করতেই সে কাছে এলে আমি খাবারের অর্ডার দিই। হেপবার্ণের নাম কি ? জানি না। এটি অড্রে হেপবার্ণের মতো তার দীঘির মতো চোখ বলে আমার দেওয়া। জর্জেন্ডেন পার্ক বেশি প্রিয়। একটু বেশি সবুজ চারপাশ। আমি হেলোফোওয়িক আলোয় দ্বীপঘেরা জলরাশি দেখি। কি অদ্ভুত এ এলাকার দেশ বা শহরগুলো। স্টকহোম শহরটাই যেন প্রচুর দ্বীপের এক প্রোডাকশন। আর, এই দ্বীপ গুলোর মধ্যে প্রচুর সেতু। সেতুগুলো যোগাযোগ রক্ষা করে। স্টকহোমের জর্জেন্ডেন হলো মুল শহরের মাঝখানেরই একটি দ্বীপ। এ শহরে সোনেটার সাথে আমার দেখাও সেতুর ওপরই। সেই সাত বছর আগে, মনে আছে তো?

স্টকহোমের দক্ষিণে কিগ্রাই দ্বীপের লামডি সেতুতে টুরিস্টরা ঘুরতে যায় সারাবছরই। টুরিস্ট কেন, স্থানীয়রাও যান। আমি সেতুর ওপর উঠছিলাম একপাশ থেকে। সোনেটা অন্যপাশ থেকে। আমার হ্যাভারস্যাকে ফানো ও আলথুস্যারের বই। সোনেটার ওভারস্যাকে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির একটা বই। আমার হাতে সিম্পল মিনারেল ওয়াটার। সোনেটার হাতে ল্যাম্ব্রা (স্পেশাল কোল্ড ড্রিংকস)। আমাদের পরিচয় সেতুর মাঝামাঝি পৌছালে। দুজনই বাঙালি চেহারা ও গড়নে একইরকম বলে কৌতুহলী। বাংলাদেশি জেনে আরেকটু আগ্রহী। সোনেটা জানতে চায়, এখানেই সেটেলড?

বলি, না আজো কোথাও সেটেলড হতে পারিনি।

এটি একটা হেঁয়ালি কথা। এটি ধরতে পারে সোনেটা। সে বলে, হেঁয়ালি রাখুন। বুদ্ধিজীবিতা দিয়া সব হয় না।
জানতে চাইলাম, কেমন?

সে বলল,কোন খাবারে কতোটা কামড় দিলে হজম হবে সেটা র‌্যাশনালি ভেবে নিশ্চয়ই আপনি আপনার খাবার খান না ?
আমি তখন টের পাই, নিচে বয়ে যাওয়া শান্ত জলরাশির মতো সে। না কোনো গর্জন নেই। নেই জলোচ্ছ্বাস। আছে বয়ে যাওয়া।

বলি, তেমন কিছু না। সাংবাদিকতা করি। একটা কাজে এসেছিলাম।

অবাক করে দিয়ে বলে , নিশ্চয়ই গ্রেটা থানবার্গ?

সে আমাকে আরেকটু কৌতুহলী করে। বলি, জ্বী।

সে তখন বলে, আমি গ্রেটাকে অনেক পছন্দ করি।এতো বাচ্চা একটা মেয়ে জলবায়ু মুভমেন্ট নিয়ে সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বনেতাদের থ্রেট করছে। ইন্সপায়ারিং।

আমি পাল্টা বলি, না , ইন্সপায়ারিং না। গ্রেটা ম্যানুফ্যাকচারিং পলিটিক্সের শিকার হচ্ছে।

সেসময় সন্ধা ক্রমাগত। সোনেটা আমার খুব কাছাকাছি। হাওয়ায় তার লং লেয়ারকাট চুলের এক ফালি এসে আমার কপালে লাগে। আমি হ্যাভারস্যাক থেকে ছোট পারফিউম মার্কা কনিয়াকের শিশি বের করে এক চুমুক দিই। সে হাসে, বলে, রাজনীতিও কী কারখানায় তৈরি হয়? তাও এ মেয়েটি কিছুই বোঝে না। সম্পূর্ণ আবেগ দিয়ে কাজ করছে সে। কী তৈরি করছে সে? তাকে ব্যবহার করেই বা কার লাভ ?

সোনেটার সাথে এই হচ্ছে পরিচয়পর্ব। এরপর বন্ধুত্ব। কিন্তু সেতুর চরিত্র বড়ো নির্মম। সেতু যোগাযোগস্থাপনকারী। ভারবাহী। আবার ভেঙেও পড়ে কোনো একদিন। সেতুকে সংস্কার করে টিকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু কতোদিন ! অবশেষে আর না হোক মৃত্যু দিয়েও তো মানুষের সম্পর্ক শেষ হয়, সেতুরও সেরকম। সেই সেতু কতো কি চায়, ডিজাইন, পাইল, স্পাম, কংক্রিট, রড, শ্রম এবং কৃৎকৌশল। একবার পেরুতে গিয়েছিলাম। কাস্কো প্রদেশের আপরিমাক নদীর ওপর যে সেতু এর নাম, কেসওয়াচাকা। সেই ইনকা আমলের । ৬০০ বছরেরও বেশি তার বয়স। বেঁচে আছে সেই সেতু। কিন্তু নতুন নতুন মৃত্যু দিয়ে যেন। ঘাসের আর পরমায়ু কতোটুকুই বা। দুই পাহাড়কে আলাদা করেছে খরস্রোতা এক নদী। সেতুটি তৈরি হয়েছিল দুই পাহাড় আর পাহাড়ি মানুষদের সংযুক্ত করতেই। সেতুটি ঘাসে বোনা দড়ির তৈরি! ঘাস জন্মায়, মরে যায়। সেইসব পাহাড়িরা আবার নতুন ঘাসে সেতু বানায় পুরনো সেতুটি ভেঙে যাওয়ারই আগে। এ যেন আমি মরলাম। আমার সন্তানকে রেখে গেলামের মতো। কিন্তু আমার আর সোনেটার তো বিয়ে হয়নি। সন্তান নেই। ফলে আমরা কেসওয়াচাকা’র মতো নই আর।

হেপবার্ণ খাবার দিয়ে যায়। খেতে খেতে ভাবি, রাতেই বাসে প্রথমে যাবো নরওয়ে। স্টকহোম থেকে ৬ ঘণ্টার বাসজার্নির দূরত্ব নরওয়ের অসলো। রাতে বাসের জানালা দিয়ে দূরের খামার কিংবা মিটে মিটে আলো জ্বলে থাকা গ্রামগুলো খুব সুন্দর দেখায়। ছবির মতো সাজানো। রাত বারোটার বাসটা ধরলে ভোরে অসলো শহরে পৌঁছে যাবো। ওই শহরে আমার পরিচিত কেউ নেই। কামালউদ্দীন নীলু থাকেন। অসলোর’র একটা ইউনিভার্সিটিতে নাট্যতত্ত্ব পড়ান। উনি মুশফিয়ার প্রেমিক ছিলেন। মুশফিয়া আমার প্রেমিকা ছিল। মুশফিয়ার মুখে ওনার অনেক গল্প শুনেছি। দেখিনি। তিনিও বিয়ে করেননি। মানে আমার মতো।কেসওয়াচাকা’র মতো জীবন উনার নয়। বা সোনেটার মতোও জীবন নয় যে কাউকে রেখে যাচ্ছেন। তার বাসা যতোটুকু শুনেছিলাম অসলোর ফ্রগনার পার্কের কাছাকাছি। শুনেছি, পার্কটি সবার জন্য উন্মুক্ত। কোনো টিকেট কাটতে হয় না। ভোরে পৌঁছে একটা ঘুম পার্কের বেঞ্চে দেয়া যাবে। অনেক গাছপালা নাকি ওই পার্কে। অনেকগুলো ভাস্কর্যও নাকি ওখানে। ওসব ভাস্কর্যে কখনো ছোট্ট শিশুর সঙ্গে বাবার কিংবা মায়ের খেলা, দুষ্টুমি, কখনো পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মান-অভিমান, প্রেম বিরহ-একাকীত্ব খুনসুটির চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এসবের স্রষ্টা গুস্টাভো ভিজল্যান্ড। তার জীবনও ছিল না কেসওয়াচাকা’র মতো। ওখানে ঘুমাতে আমার মন্দ লাগবে না। যদিও এ পার্কটি হাঁটার জন্য বিখ্যাত। কিন্তু আমার তো আর না হাটলেও চলবে আজ থেকে। আমি কাল ভোরে পৌঁছে ঘুমাবো। এরপর গুগল ম্যাপে কামালউদ্দীন নীলুর বাসা খুঁজব। ঠিকানা তো জানি। না থাকুক পরিচয়। মুশফিয়া আমাকে ছেড়ে যখন উনার প্রেমে পড়ল তখন ওকে বলেছিলাম তোমাদের বিয়ে হলে কামালউদ্দীন নীলু ভাইয়ের অসলোর বাসায় বেড়াতে যাবো। মুশফিয়ার অন্যত্র বিয়ে হয়েছে ঢাকায়। এতে আমার সমস্যা নেই। মুশফিয়া ছাড়া আমি গেলে কি আমাকে উপেক্ষা করবেন ! করলে করবেন। তবু যাবো। বিল পেমেন্টের সময় হেপবার্ণ পাশে ছিল। একটু হাসি। যেন ওটিও দোকানে বিক্রি হয়।

যেভাবে বিক্রি আমি হয়েছিলাম। সোনেটার কাছে। দেনমোহন ছাড়া। যেনবা শপিংমলের গিফটবোনাস। সেবার , মানে প্রখমবার সোনেটার সাথে দেখা হওয়ার পর আমি ঢাকা ফিরে আসার পর ওর সাথে হোয়াটসঅ্যাপে মাঝেমাঝে কথা হতো। সে আমাকে কখনো তার অটিস্টিক শিশুর গল্প শুনাতো। সেসব স্পেশাল চাইণ্ডরা কি করে সেসব বলত। আমি মনোযোগ দিয়ে শোনার ভান করতাম। ভানের কথা এ জন্যই বলছি কারণ আমি এমন শিশুদের মনোজগত নিয়ে গুস্তফ ইয়ুং এর একটা বই পড়েছিলাম। এসব অটিস্টিকদের নিয়ে যুগোস্লাভিয়ান পরিচালক মিরাজভ একটা মুভি বানিয়েছিলেন। নাম, ‘ইয়েট ব্রিজ ব্রোকস’ তিনটা দৃশ্যের উদাহরণ দিই।

প্রথম দৃশ্য:

একটা রেল স্টেশন। সেখানে ম্যাজাক ( অটিস্টিক শিশু) দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে। বয়স তেরো/চৌদ্দ। শেষ বিকেল। রোদের আভা খেলা করছে তার চোখেমুখে। সে অপেক্ষা করছে একটানা তিনদিন থেকে। কারণ তিনদিন আগে ম্যাজাক তার মায়ের সঙ্গে ঠিক যেখানে দাড়িয়ে আছে সেখানেই দাড়িয়ে ছিল। সেদিন এক মানুষ যাওয়ার সময় ঠিক ওখানেই তার হ্যাভারস্যাক থেকে একটা হারমোনিকা পড়ে গিয়েছিল। সেই হারমোনিকা ম্যাজাকের মা তুলে অল।প সুর তোলে ছিল। সেদিন থেকে ম্যাজাক ওইসময় হলেই তার মা’কে তাড়া করে রেল স্টেশনে আসতে। কারণ তার ধারণা , সেই টুরিস্টটি আবার যাবে। আবারও একটি হারমোনিকা ভুলবশত পড়ে যাবে।আর তার মা সেটি তুলে শুরু তুলবে আরও আরও আছে সে তখন নাচবে। এ কথাগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে বলতে শোনা যায়। দৃশ্যে ম্যাজাকের মায়ের হাত ধরে অপেক্ষা। রোদের আভা। একটু লাফিয়ে নাচের মুদ্রায় দুটো চক্কর। যেন ধুলোঝড়ের ঘুর্নির মতো সেই নাচের মুদ্রা মিশে যাচ্ছে মুহুর্তেই। এরপরই চিৎকার। কারণ সেই টুরিস্ট আসেনি। ফেলে যায়নি হারমোনিকা।

দ্বিতীয় দৃশ্য :

এ দৃশ্যে দেখা যায় ম্যাজাকের বয়স প্রায় তিরিশ। সে একটা পার্কের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে আর বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে জগিং করছে আর বলছে ‘ সেভ দ্য এনভয়রমেন্ট, ইয়া ইয়া ’। নেপথ্যে শোনা যায়, ম্যাজাক ঠিক এসময় দেখেছিল এ পার্কে এক লোক এভাবে এসব কথা বলে সকালবেলা যাচ্ছিল । এরপর থেকে সে ও সকাল হলে এ পার্কে আসে এমন মনে করে অন্যসব জগিংরত মানুষরা তার এ দৃশ্য উপভোগ করবে।

তৃতীয় দৃশ্য:

এক চিকিৎসকের চেম্বারে বসা ম্যাজাককে নিয়ে তার মা মিলিনিয়া। মিলিনিয়াকে সেই চিকিৎসক বলছেন, এদের নিউরোব্যাংকে স্মৃতি বেশিদিন স্থায়ী হয় না। ডিলিট হয়ে যায়। প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই নতুন নতুন স্মৃতি জমা হয়। সেই স্মৃতিগুলো আবার বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো স্পর্শকাতর ঘটনা দেখে। যে ঘটনা তাদের স্পর্শ করে। এরপর দেখা যায় সেই নতুন স্মৃতি নিয়ে তারা বিভোর হয়। ফের ভুলে যায় পুরনো স্মৃতি। চিকিৎসকের কথা শেষ হতে না হতেই একটা ড্রপসিন পড়তে দেখা যায়।

সেই মুভিতে আরও দেখা যায় ম্যাজাকের মা মিলিনিয়ার অসহায়ত্ব। তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। প্রেম নেই। নতুন বিয়েতে ভয় পায়। হারানোর ভয়। সন্তান জন্ম না দেওয়ার ভয়। ম্যাজাকের জন্য তার সব ভালোবাসা তুলে রাখছে কিন্তু ম্যাজানকে হারানোরও ভয়। মিলিনিয়া অবাক হয় এবং বিরক্ত। দীর্ঘ কঠিন পথ পেরিয়ে একদিন এক পাহাড়ের টিলায় যায়। সে ভেবেছিল, এখানে এলে খুঁজে পাবে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর। এই টিলা ব্রহ্মজ্ঞানের উৎসমুখ, এমনটাই শুনেছিল। পৌছে দেখে, সেখানে বসে রয়েছে এক লোলচর্ম বৃদ্ধা। শনের নুড়ির মত চুল, কোটরগত চোখ। এর কাছেই রয়েছে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর? সন্দেহ হয় মিলিনিয়ার, ভুল ঠিকানায় যায়নি তো? তাও প্রথম প্রশ্নটা করেই ফেলে , " বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি আমি। সবকিছুর প্রতি, সকলের প্রতি। মনে হয়, এক কঠিন ফাঁদে পড়েছি যা কেটে বেরোনোর পথ নেই কোনও। যাকেই বিশ্বাস করেছি, সেই আঘাত করেছে, বারংবার আঘাত এসেছে অতর্কিতে। বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না আর৷ আমার কি আত্মহত্যা করা উচিৎ? আত্মহত্যা করতে চাই না। অনেক লড়েছি। কিন্তু এন্ড অব দ্য ডে মনে হয় কিছুই নেই আমার।

বৃদ্ধার এক শব্দের নির্লিপ্ত উত্তর, "ভালোবাসো"।

ভালোবাসব! কাকে! ভালোবাসার যোগ্য কোনও মানুষই খুঁজে পেলাম না! কাকে ভালোবাসব?

কোনও একজনকে নয়৷ সবাইকে৷ সবকিছুকে। ঘাস থেকে শুরু করে সুদূর মহাকাশ পর্যন্ত, সব্বাইকে।

ধুর! কোনও কথা হল এটা? ভালো একজনকেই বাসা যায়। একটাই মানুষকে। সকলকে ভালোবাসা যায় নাকি?

যদি একজনকে ভালোবাসা যায়, তবে সবাইকে যাবে না'ই বা কেন? তোমার ভালোবাসাকে কী ভাবো? মোহরের ঘড়া? আগলানোর জন্য যক্ষ নিয়োগ করতে চাও যে বড়ো ? যেদিন তুমি ভাবতে শুরু করেছ, ভালোবাসা কোনও এমন সম্পদ যাকে সিন্দুকে তালা মেরে রাখবে, আর শুধু এমন কারও হাতেই সমর্পন করবে যে সেই সম্পদের কদর জানে, সেদিন থেকেই, জেনো, একমাত্র নিজেকে ভালোবেসেছ তুমি। আর কাউকে না। যাও, তালা খুলে দেখে এসো, ও ঘড়া শূন্য। কিচ্ছু নেই।

ভালোবাসতে আধার লাগে না মানুষের ?

খুঁজে নিয়েছিলে তো আধার। কী হল?

কী আবার হবে? সোনা ভেবেছিলাম যাকে, দেখলাম সে পিতল। ঘৃণা হল।
কেন? পিতল কি ঘৃণার যোগ্য? পিতলকে ভালোবাসা যায় না, আর সোনাকে যায়? কেন? দামী বলে? অর্থমূল্যে হিসেব করো ভালোবাসার? তবে যাও, মুদির দোকান খোলো। দুশো কেজি চিনি মাপবে দাঁড়িপাল্লায়, ঠোঙায় মুড়ে দিয়ে দশ টাকা বুঝে নেবে। শান্তি পাবে এতে।

মিলিনিয়া আর নিতে পারে না। চেচিয়ে বলে, আপনি কে তা জানি না। তবে জ্ঞান আপনার নেই বললেই চলে। ভালোবাসা অবশ্যই দামী জিনিস। যে কেউ পারেও না ভালোবাসতে। অনেক, অনেক সাহস লাগে।

সেই বৃদ্ধা উত্তর দেয় আর ক্ষীনকন্ঠে উত্তর দেয়, তা লাগে বটে। সত্যিই ভালোবাসতে পারলে, লাগে। কিন্তু সে তো তুমিও পারোনি। স্যাকরার দোকানে যে জিনিস ওজন হয়, তা আর এমন কী দামী হল? তার দাম নিয়ে তো দরাদরিও চলে। সেই জিনিস অমূল্য, যার দাম হয় না, ওজন হয় না, কোনও হিসেবে যাকে বাঁধা যায় না মিলিনিয়া বলে, আর সেই অমূল্য জিনিস তুলে দেব যার তার হাতে? টিপেটুপে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে খেয়ালখুশি মত ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে যাবে সে? পথের ধারে পড়ে থাকব পরিহার্য এক বস্তু হয়ে? ঘাসফুলের মতোন ? আমার কী নেই? সব আছে।

তাতে কী? বিনামূল্যের যে কোনও জিনিসই যে পরিহার্য হয় একদিন।

মিলিনিয়া জবাব দেয়, তবে বিনামূল্যে বিলোব কেন ভালোবাসা?
কারণ মূল্য ধরলে যে আর সে জিনিস অমূল্য থাকে না। দাম লেখা চিরকুট গলায় ঝুলিয়ে নিতে হয়। গিয়ে বসতে হয় বাজারে, বিক্রি হতে। নিজেকে সাজিয়ে রাখতে হয় দোকানের কাঁচের জানলায়। তাকেই তো কেনা যায়, যার মূল্য আছে। যা অমূল্য, তা যে একমাত্র বিনামূল্যই হতে পারে।

তাতে কী লাভ? যার মূল্য কেউ দিতেই পারে না, তা থেকেই বা কী লাভ? কী পাব, আমি?

লাভ নেই তো। কোনও লাভ নেই। লাভ-ক্ষতির হিসেব যদি করতে চাও, তবে ক্ষতি আছে। নিদারুণ ক্ষতি। আঘাতে জর্জরিত দেহমন, সেও আছে। কী পাবে? অত আঘাত সহ্য করেও ফের উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পাবে, বারংবার। যন্ত্রণায় ডুবে গিয়েও ফের হাসি ফুটবে মুখে। আলো পাবে, অনেক অনেক আলো। আলোয় ঝলমল করে উঠবে তুমি।

মিলিনিয়া এবার জানতে চায়, সে কেমন করে হবে? ভালোবেসে ভালোবাসা ফেরৎই যদি না পেলাম, তবে তো অন্ধকারে ডুবে যাব আমি!
এমন মনে হচ্ছে, কারণ এখনও তুমি ভালোবাসাকে ভাবো মোহরের ঘড়া। ভাবো, যোগ্য জহুরির কাছে নিয়ে গেলে সে কদর করে উপযুক্ত মূল্য দেবে তোমায়। মূল্যের প্রত্যাশী হলে ব্যবসা করো, লাভবান হবে। ভালোবাসতে যেও না। কারণ ভালোবাসা তো সোনা নয়, সে হল পরশপাথর।
পরশপাথর ?

হ্যাঁ। যে পারে ভালোবাসতে, সত্যিই পেরে ওঠে, যে চারিপাশের সমস্ত সস্তা ও দামী, জড় ও জীবন্ত, খারাপ ও ভালো, নিত্য এবং অনিত্য, সবটাকে, এই সবটাকে দু'বাহুতে জড়িয়ে নিতে পারে, আগলে রাখে স্নেহে, শাসন করে অধিকারবোধে, মুগ্ধ হয় প্রেমে, রিক্ত হয় ভালোবাসায়, সে মানুষের ভালোবাসা হয়ে ওঠে পরশপাথর। এইটুকু এক নুড়ি মাত্র। তার নিজের কোনও মূল্য নেই। তাকে কেউ যত্নে তোলে না সিন্দুকে৷ কিন্তু সে যাকে ছোঁয়, সে হয়ে ওঠে সোনা। আলো সে আহরণ করে না অন্যত্র। আলো জন্মায় তার নিজের মধ্যেই৷ যে অন্ধকারে সে ডুবে ছিল, সেই অন্ধকারের গর্ভ থেকেই জন্মায় আলো।

মিলিনিয়া জানতে চায়, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আমি। কিচ্ছু না। কাকে ভালোবাসব তবে? কাকে ভালোবাসব?

বৃদ্ধা রুক্ষ জমি থেকে একটা বদখত পাথর তুলে নেয় হাতে৷ বলে, যাও, একে ভালোবাসো।

এই পাথরটাকে?

হ্যাঁ, পাথরটাকেই। ভালবাসো, তোমার 'আমি'টাকে উজাড় করে ভালোবাসো, এই নিতান্ত বিনামূল্যের পাথরের টুকরোটাকে।

কেন? কেন ? কেন ? এটাকে কেন? মিলিনিয়া ফের চিৎকার করে জানতে চায়।

বৃদ্ধা এবার বলে, তুমি যেখানে জন্মেছ, এই পৃথিবী, সেও তো এমনই একটা পাথরেরই টুকরো, তাই। সেই বিরাট পাথরটারও মূল্য নেই কোনও। কেনা যায় না, বেচা যায় না। তাই না? যদি আধার লাগেই, তবে এই নাও আধার। আজ এইটুকু পাথর তোমার বুকের খাঁচার মাপমত হবে। যদি সত্যিই পারো ভালোবাসতে, অবোধ শিশুর মত ভালোবাসতে পারো একটা সামান্য নুড়িপাথরকে, তবে তুমি বাড়তে থাকবে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে। বাড়তে থাকবে তোমার ভালোবাসার আকাশ। বাড়তে বাড়তে একদিন গোটা ব্রহ্মান্ডটাকেই জড়িয়ে নিতে পারবে তুমি ভালোবেসে। আলাদা করে আর কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার থাকবেই না।

সোনেটাকে আমি বাধ্য হয়ে এ মুভির গল্পটা একদিন শুনিয়েছিলাম। কোনো এক রোববার রাতে বাংলাদেশ সময় বারোটায় সোনেটা ফোনকল দেয় হোয়াটসঅ্যাপে। সোনেটা চমকে দিয়ে জানায়, তার সাথে মিলিনিয়ার হাহাকারের অনেক মিল আছে। জানতে চায়, আমি কী তার পরশ পাথর হবো ?

প্রেমের শুরুটা এভাবে। ছয় মাস আমাদের ভার্চুয়াল প্রেমের পরিণতিতে আমি সুইডেন তার কাছে যাই। বেশ ছিল। কারণ আমি তো অমুল্য কেউ না। কম ছিল, সোনেটার প্রত্যাশা। বেশ ছিল আমাদের সংসার জীবন। কাগজবিহীন। কাবিনবিহীন। আমরা নদীপাড়ে দাড়িয়ে শুধুই কবুল কবুল বলেছিলাম। কতো কি, সে আমার লম্বা চুল আচড়ে দিতো। পনিটেল ঠিক করে দিত। আমি ওর চুলে ওয়েল মেসেজ করে দিতাম। ছুটির দিনে হেরিটেজের দোহাই আমরা ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে গান শুনতাম। দুরের দুরের শহরে বড়োতে যেতাম। আমাদের সঙ্গী তার ছোট ছেলেটা। তার নাম নীল। নীলকে আমি যেন মুহুর্তে মুহুর্তে যতোক্ষণ সময় পেতাম দিতে চাইতাম নতুন নতুন স্মৃতি। কারণ আমার মনে হতো নতুন নতুন স্মৃতি আমি যতো দিবো সে ততো পুরনো স্মৃতি ভুলে গিয়ে স্মৃতির পাহাড়ে শেরপার মতো উঠে যাবে আর ফিরে যাবে স্মৃতি না হারানোর জগতে।

কিন্তু আমি এ কাজে এতো মেতে উঠলাম যে সোনেটা একদিন আমায় বলল, তুমি কি কিছুই করবে না ? তার কথার মানে বুঝিনি। আমি বললাম নীলের কোনো সঙ্গী নেই। আমি ধীরে ধীরে নীলের ভুবনে ঢুকে যাচ্ছি। আমি ও নীল মিলে স্মৃতির পাহাড় জমানোর খেলায় মেতেছি। কিন্তু সোনেটা আমার মতো ভাববে কেন ? জীবন খুবই ব্যয়বহুল, নাকি ? কাল রাতেই সোনেটাকে আমি বললাম, বলতে বাধ্যই হলাম, তোমার হিসেব নিকাশে আমি নেই। আসলেই জীবন ব্যয়বহুল। আমার তো জন্মগত কোনো নীল নেই। আমার তো কোনো দেশ নেই। আমার তো তোমার মতো কেসওয়াচাকা’র জীবন নেই। ফলে আমার ছিল নন-ম্যানুফ্যাকচারিং সব কিছু । আর তুমি ধরতে পারোনি ম্যানুফ্যাকচারিং গ্রেটাকে। তুমি সোশ্যাল ডেমোক্রেট। আর আমি ওরকম কোনো ইজমের জগতেই বিলং করি না। আমি আসলে পরশপাথর ছিলাম না কখনোই। নেহাতই পাথর।
রাত সোয়া এগারোটার নরওয়েগামী বাসে উঠি আমি। বাস চলছে। রাস্তার দু’পাশের খামারগুলো দেখি। খুব মায়াময়। একটা অধ্যায় । একটা দৃশ্যের ভেতর দিয়ে যেন যাচ্ছি আমি। এর বেশি কিছুই নই। দিনের শুরু নেই। শেষ নেই। সময় যেন একটা শ্রেষ্ঠ কল্পনা।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top