ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর ২০২০, ১১ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

শিক্ষিকাকে বাঁচাতে পারেননি ডাক্তার ছাত্রী, নাড়ি ছেঁড়া ধনকে বাঁচানোর লড়াই


প্রকাশিত:
৭ জুন ২০২০ ১৯:২২

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ০৯:১০

সংগৃহীত

চিকিৎসক হৈমন্তিকা শ্রেয়া সদ্য প্রয়াত শিক্ষক তাজিনকে নিয়ে গভীর মর্মবেদনার এক লেখা লিখেছেন। ভিকারুননেসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের অত্যন্ত শিক্ষার্থী-ভালবাসা ধন্য শিক্ষক তাজিন। তিনি মারা গেছেন সদ্যজাত দুগ্ধপোষ্য শিশুকন্যা রেখে। যে নবজাতক শিশুর মাতৃদুগ্ধ একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু কে দেবে জীবন সম মাতৃদুগ্ধ।

ডা. হৈমন্তিকা শ্রেয়ার লেখা পড়ে পাঠক কাঁদতেও পারেন অঝোরে। মুখোমুখি হতে পারেন সেই অসাধ্য দুরুহ জীবনবাস্তবতারও। ফেসবুকে হৈমন্তিকা শ্রেয়া যা লেখেন তা দেশের কাগজ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

পুরো লেখাটি পড়ার অনুরোধ রইল।গত কয়েকদিন আমার উপর দিয়ে যা গেল আমি স্বাভাবিক ভাবে কোন কিছু লেখার অবস্থায় ছিলাম না।অনেকের অনেক মেসেজের রিপ্লাই ও দিতে পারিনি।

মৃত্যু অনস্বীকার্য। Death is one of the most cruel truth on earth where our life is a beautiful lie.আমি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে মৃত্যু কে কখনই ভয় পাইনি।যা অবধারিত তাকে মেনে নেয়াই শ্রেয়।আপনারা অনেকেই জানেন আমি দীর্ঘদিন ব্যক্তিগত কারনে clinical depression এর পেশেন্ট ছিলাম।এবং বলতে দ্বিধা নেই বহুবার মৃত্যুচিন্তাও এসেছে আমার।রবি ঠাকুর মৃত্যুকে নববধূর আলিংগনের সাথে তুলনা করেছেন।ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী তে রয়েছে- "মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান"। পেশায় আমি চিকিৎসক। গত বছর থেকে শিক্ষকতা শুরু করেছি Anatomy ( মৃতদেহ এবং কংকাল বিষয়ক subject) তে clinical and administrative career এর পাশাপাশি।বহু মৃত লাশ ঘেটে দিন যায় আমার।গ্লাভস ছাড়াই মৃতদেহ ধরে অভ্যাস আমাদের।বাসায় আমার কংকালটার নাম দিয়েছি উইনি।বহু মৃত্যু চোখের সামনে প্রতিনিয়ত দেখে দেখে গায়ে লাগেনা।আমার পরিবার আমাকে পাষান হিসেবেই জানে।আমার আপনজনের মধ্যে আমার ঠাকুরমা,সন্ধ্যাপিসির মৃত্যু আমার সামনেই।সত্যি বলতে বয়স্ক, দীর্ঘদিন রোগে ভোগা মানুষের মৃত্যু আমায় কষ্ট দেয়না।বরং মনে হয় সে যেন অনেক কষ্টের পর অপার্থিব শান্তি পেল।কিন্তু আমার ভিকারুননিসা স্কুলের তাজিন ম্যাডামের মৃত্যু আমার মত পাষান মেয়েরও ভিত কাঁপিয়ে দিল।তাজিন ম্যাডাম আমার direct teacher নন।কিন্তু ভিকিদের খুবই প্রিয় এবং পরিচিত মুখ। আমাদের কোন ক্লাসে কোন ম্যাডাম অনুপস্থিত থাকলে উনি পড়াতে আসতেন।

আমি চরম বাচাল ছাত্রী ছিলাম।পাশের মেয়ের সাথে কথা বলার জন্য কত যে শাস্তি পেয়েছি।কিন্তু তাজিন ম্যাডাম খালি মুচকি হাসতেন আর বলতেন - এত কথা বলেনা!ম্যাডাম বহু কষ্টের পর ৪২ বছর বয়সে প্রথম মা হতে চলেছিলেন।অনেক complications ছিল।আমি জানতাম ই না উনি pregnant.এখন মনে হয় কেন খোঁজ রাখিনি? কেন এক সপ্তাহ আগে থেকেই উনাকে আমার হাসপাতালে এনে রাখিনি? করনার জন্য উনি নিয়মিত চেক আপ ও করেন নি।সাথে উনার diabetes,hypertension,PCOS,cardiac problem,respiratory problems.আমি সেদিন সন্ধ্যায় Fatema Zohra Haque Jannatul Ferdous ম্যাডামের ফোন পেয়ে জানতে পারি তাজিন ম্যাডাম কে গুরুতর অবস্থায় করনা সন্দেহে তিনটি হাসপাতাল( নাম জানতে চাইবেন না প্লিজ) ভর্তি করেনি। আমি বললাম এখুনি আমাদের ইউনিভারসেল এ নিয়ে আসুন।আমাদের করনা হলে হবে।কিন্তু উনাকে এভাবে মরতে দেয়া যায়না।ভয়াবহ অবস্থায় উনাকে রিসিভ করে আমার টিম।বাচ্চার কোন heartbeat নাই।আমি ব্যক্তিগত গাড়ি পাঠিয়ে প্রখ্যাত গাইনি বিশেষজ্ঞ নুরুন নাহার আন্টিকে আনিয়ে নিলাম।বললাম আন্টি উনি কিন্তু covid suspected.হয়ত আজকেই আমরা সবাই করনায় আক্রান্ত হয়ে যাব।

আন্টি বল্লেন- রাখ তোমার covid! আমি খালি প্রে করছিলাম শিশুটি যেন জীবিত থাকে।দীর্ঘ critical complicated C section এর পর গোলগাল ২.৯ কেজির এক কন্যাশিশুর ক্রন্দন- সে জানিয়ে দিল তার আগমন বার্তা। মূহুর্তের মধ্যে দেখি শিশু নীল হয়ে যাচ্ছে।তৎক্ষনাৎ NICU.তাজিন ম্যাডামকে নিয়ে গেলাম CCUতে। সেই রাতেই ম্যাডামের একবার mild cardiac arrest হল।আমরা ভাবলাম মা মেয়ের কি রাত টা কাটবে? ভয়াবহ এক রাত! প্রকৃতি ও যেন আমাদের কষ্ট বুঝেছে।বাইরে অঝোর বৃষ্টি।আমার ভিকারুন নিসার সব ম্যাডাম তখন দোয়া পরছেন।মা মেয়ের জন্য
cardiologist,pulmonologist,medicine specialist,child specialist,critical care specialist,anesthesiologist এমনকি একজন psychiatrist নিয়ে মেডিকেল টিম তৈরী করলাম।

উনার স্পেশালিষ্টদের সকাল বিকাল আমি জ্বালিয়ে মেরেছি।তার মধ্যে pulmonologist জন আমার প্রিয়তম আপনজন।তাকে হুমকি দিয়েছি আমার ম্যাডাম এর কিছু হলে তোমাকে খুন করব। তাজিন ম্যাম ventilator control mode এ।বাবুও ventilator এ।কিন্তু অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে মা মেয়ে সুস্থ হতে লাগল।এর মধ্যে সব ধরনের test করিয়ে বুঝলাম ম্যাডামের করনা নেই।দারুন স্বস্তি।ম্যাডামের জ্ঞান ফিরে এল।ventilator spontaneous mode এ
দেয়া গেল।বাবু তখন head box এ অক্সিজেন পাচ্ছে।তাকে অন্যান্য মায়েদের কাছ হতে দুধ নিয়ে প্রতি ঘন্টায় খাওয়াই।এইটুকু শিশু কিন্তু দারুন প্রানশক্তি।চিৎকার করে কাঁদে, দুধ খেয়ে নেয় একবারে।Feeding amount বাড়িয়ে দিলাম।কিন্তু ম্যাডাম ভাল হচ্ছেন আর এর মধ্যে বাবুর congenital defect - PDA,PPHN ধরা পড়লো।

আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেল।কিন্তু আমাদের legendary child specialist মনির আংকেল আশ্বস্ত করলেন এসব defect দ্রুত সেরে যাবে।আমি আর আমার ভিকারুননিসা ফেমিলি আবার আশায় বুক বাঁধি।ম্যাডামকে যেদিন লাইফ সাপোর্ট থেকে মুক্ত করা গেল আমি বাসায় এসে আক্ষরিক অর্থেই কিছুক্ষণ নাচি।পরদিন দেখি ম্যাডাম সবার সংগে communicate করতে পারছে।আয়াদের দিয়ে টাইট করে উনার মাথায় বিনুনি করে দিলাম।

বাবুকে CCU তে আনা সম্ভব নয়।উনাকে বাবুর ছবি দেখালাম,ভিডিও দেখালাম।সে কি অপার্থিব খুশি bipep লাগানো অই অসুস্থ চেহারায়।বাবুও সুস্থ হচ্ছে।head box,oxygen support ছাড়াই ভাল আছে।বাবুকে কেবিনে shift করলাম NICU থেকে। আমি স্বপ্ন দেখছি কবে মা মেয়ে সুস্থ হবে আর আমরা সবাই celebrate করব।স্রষ্টা কখনই আমার স্বপ্ন পূরন করেন না। রাত এ হঠাৎ ম্যাডামের জ্বর, নিস্তেজ হয়ে গেলেন।আমি ডাকলাম ম্যাডাম!

কোন সারা নেই।তাজিন বলে চিৎকার দিলে একটু করে তাকায়।বুঝলাম সব report দেখে septic shock এর দিকেই যাচ্ছেন উনি।সে রাতেই উনার সব স্পেশালিস্ট দের নিয়ে আবার medical emergency meeting হল।antibiotic add করা হল।স্বনামধন্য medicine professor Md Ridwanur Rahman আংকেল সারাক্ষন উপদেশ দিয়েছেন কি করতে হবে।আমি খালি উনার একটা জিনিস নিয়েই ভয় পাচ্ছিলাম।হৃৎপিণ্ড। অই অংগটি বড়ই unpredictable.উনার একবার তো c section এর রাতে heart attack হয়েছিল।আমি তারপরও আশা ছাড়িনা।সেই রাতে আবার ECG,Echo, Troponin I করা হল।দেখলাম heart stable আছে।কিন্তু আমার ভয়টাই সত্যি হল।বিকাল ৪ টাই আন্দালিব আপু জানাল severe cardiac arrest হয়েছে। CPR,shock দেয়া হচ্ছে।হাসপাতাল থেকে এসে তখন আমি একটু শুয়েছিলাম।হন্তদন্ত হয়ে ঘরের জামা পরেই দৌড় দিলাম এবং একটা message আসল আপুর কাছ হতে- SHE EXPIRED!.

আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম।এতদিনের এত কস্ট,এত রাত জাগা,আমার হাসপাতালের full team এর এত অক্লান্ত পরিশ্রম,ভিকারুননিসা ফেমিলির এর এত দোয়া, প্রার্থনা সব কি মিথ্যা? আমি খালি বলেছিলাম- ঈশ্বর তুমি মিথ্যা! আমি আর তোমায় বিশ্বাস করিনা।স্রষ্টার উপর বিশ্বাস ফিরতে বহুদিন লাগল।কিন্তু আমার মত শত মৃত্যু দেখা মানুষ এই ট্রমা কাটাতে পারিনি।আমার ভিকারুননিসার সকল শিক্ষক কে অসংখ্য ধন্যবাদ এই বিপর্যস্ত সময়ে আমার পাশে দাঁড়ানোর জন্য। ম্যাডাম হাতে করে আমাদের attendance copy নিয়ে আসতেন আর আমি আমার হাতে উনার death certificate carry করলাম।

আমি আসলেই এক নিষ্ঠুর পেশা বেছে নিয়েছি।সেদিন আবারও ঝড়, তুমুল বৃষ্টি।এ আমার, আমাদের চরম পরাজয়ের কাহিনী। Zinnat Talukder ম্যাডাম বল্লেন তোমরা জেতা ম্যাচ হেরে গেলে।আমার মা,প্রিয় সখী Zeyran Mehrnush Juhie বল্লো শ্রেয়া তুমি ঠিক আছ? বললাম বেচে আছি।ডাক্তার কে তো বাঁচতেই হবে।আপনাদের সাথে আমি আমার চরম বেদনার কাহিনী শেয়ার করলাম, আমার গুরুমাতার( বেদ, পুরানে বলা হয়েছে শিক্ষক গুরুপিতা বা গুরুমাতা এবং শিক্ষকের পায়ের নিচে আমাদের স্থান) প্রয়ান কাহিনী শেয়ার করলাম। যদি কষ্ট করে পড়ে থাকেন ধন্যবাদ।শেয়ার করলেও আমার আপত্তি নেই।আমার গুরুমাতা র চিরবিদায়ের চেহারা আপনাদের সামনে আনতে চাইনি,heart failure, pulmonary oedema হয়ে তার নাক মুখ দিয়ে bleeding হচ্ছিল।কিন্তু মুখে অপার্থিব শান্তি। তার পা ছুয়ে প্রনাম করে আমি শেষ বিদায় দিলাম। নিচে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি।

" দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি বেলা দ্বিপ্রহর,যেতে নাহি দিব হায় তবু যেতে দিতে হয়"
আপনারা সবাই আমাকে, আমাদের Universal hospital full team কে ক্ষমা করে দিবেন।ম্যাডাম কে আমি বাঁচাতে পারিনি,তার মেয়েটিকে যেন বাঁচাতে পারি।

ম্যাডামের স্বামী যিনি আমাকে ছোট বোনের সম্মান দিয়েছেন তার অনুমতি নিয়ে আমি এই দুই যোদ্ধা মা -মেয়ের ছবি শেয়ার করলাম, যাদের আমি একত্রিত করতে পারিনি।



বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top